তাসীন মল্লিক
৩০ জানুয়ারি ২০২২, ০৫:০৪ পিএম
৩০ জানুয়ারির কয়েক রাত পরেই ফিরে আসবে আরেকটি নতুন ফাল্গুন। ৫০ বছর ধরে প্রতিবছর ফাল্গুন ফিরে আসছে। কিন্তু ফিরে আসেনি জহিরুল্লাহ। ১৯৭২ সালে ৩০ জানুয়ারি বড় ভাই শহীদ সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সারকে খুজতে বের হন জহিরুল্লাহ। শিক্ষা জীবন সম্পন্ন করার আগেই শুরু হয় তাঁর সাংবাদিক জীবন, ১৯৫০ সালে। ছয় বছরের মধ্যেই কর্মস্থল ‘যুগের আলো’ পত্রিকা ছেড়ে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন প্রবাহ পত্রিকায়। একাধিক সংবাদপত্রে কাজ করেছিলেন তিনি। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন জহিরুল্লাহ।
মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ খান। একাধারে একজন সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্র পরিচালক এবং প্রযোজক। কাগজে, ফিল্মে যিনি লিপিবদ্ধ করেছিলেন বাংলাদেশকে। মাত্র ৩৭ বছরের জীবনকালে তার অর্জন অমর হয়ে আছে বাংলার ইতিহাসে।
ইন্টারমিডিয়েট পড়া অবস্থাতেই পুরোদস্তর রাজনৈতিক ব্যক্তি বনে যাওয়া জহিরুল্লাহ গভীর ভাবে অনুধাবন করতেন মুক্তির আকাঙ্খা। ব্রিটিশ শোষণের বর্বরতা স্বচক্ষে দেখেছেন। ৪৭ এর দেশভাগের পর কলকাতা থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হয়ে সম্মুখীন হন নতুন শৃঙ্খলের। নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য ছিলেন মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ খান। কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মণি সিংহ তাঁর ছদ্ম নাম দিলেন রায়হান। সর্বজনের কাছে জহির রায়হান নামে পরিচিত হলেন তিনি।
দেশভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তানের জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠলেন জহির রায়হান। এর মধ্যে ভাষা আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়ল পূর্ব পাকিস্তানে। ১৯৫২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারি দশজন সাথে নিয়ে ১৪৪ ধারা ভাঙলেন ঢাকা কলেজের ইন্টারমিডিয়েট ছাত্র জহির রায়হান। এরপর আসে উনসত্তুর, অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে তিনি অংশ নেন সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। সত্যেন সেনের নেতৃত্বে গড়ে তুলেন উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী। একই বছর তিনি রচনা করেন ভাষা-আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা বিখ্যাত উপন্যাস 'আরেক ফাল্গুন'।
দিন দিন ঘনিয়ে আসা মুক্তির সংগ্রামে প্রেরণা যোগায় ‘আরেক ফাল্গুন’। শোষকের ভীতিকে উপেক্ষা করে সংগ্রাম এবং সংগ্রামের সাথীদের চিনতে শিখিয়েছেন জহির রায়হান। উপন্যাসে তাঁর রচিত এক চরিত্রের সংলাপ ‘আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হব’ আজও উচ্চারিত হয়।
১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কলকাতায় চলে যান জহির রায়হান। বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ঘুরে সংগ্রহ করেন নির্মাণ করেন প্রামাণ্যচিত্র 'স্টপ জেনোসাইড'। পৃথিবীব্যাপী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ব্যপক জনমত গঠনে সহায়তা করে প্রামাণ্যচিত্রটি। এরপর যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে আসেন জহির রায়হান। বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার নিখোঁজ ছিলেন ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে। বড় ভাই মিরপুর বারো নম্বরে বন্দী আছেন এমন অজ্ঞাত ফোনে ঘর থেকে বের হয়ে যান তিনি। এরপর আর কোন খবর পাওয়া যায়নি তার। ঠিক আরেকটি নতুন ফাল্গুনের প্রাক্কালে হারিয়ে যান জহির রায়হান।
এরপর বার বার ফিরে এসেছে ‘আরেক ফাল্গুন’, শুধু ফিরে আসেননি তিনি। অপেক্ষা দীর্ঘ হতে হতে অর্ধ শতাব্দী পার হয়েছে। অন্তর্ধানের কূলকিনারা হয়নি। হয়ত ফিরে আসার অপেক্ষা করতে হবে ‘হাজার বছর ধরে’।